করোনাকালে যখন দিনের পর দিন, জীবন বাজি রেখে কাজ করে গেছি; তখন সম্বল ছিল কেবল মানুষের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার জোড়ে নিজের পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়েছি। নিজের যা কিছু ছিল তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছি সেবা দেয়ার জন্যে। লক্ষ্য ছিল একটাই; তা হচ্ছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

ভালোবাসার অন্যদিকে জোড়ালো কিছু ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছে। এখনো ষড়যন্ত্রকারীরা বসে নেই। সেই ষড়যন্ত্রকারীদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছে, কয়েকটি ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল। এসব তথাকথিত সংবাদমাধ্যম আমার বিরুদ্ধে একের পর এক উস্কানিমূলক, মনগড়া ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করে আসছে। সম্প্রতি একটি পোর্টাল আমার জন্মস্থান ও নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যা তথ্য প্রচার করেছে। “ডা. ফেরদৌসের ভণ্ডামী ধরা পড়েছে” এবং “বিতর্কিত ডা. ফেরদৌস বাংলাদেশী নন, পাকিস্তানী!” পুরোপুরি মিথ্যায় সাজানো এই দুটি শিরোনামের সংবাদ আমার নজরে এসেছে। বিষয়টি খুবই দু:খজনক, আপত্তিকর এবং মানহানিকর। নিচের এ বিষয়ে আমার সুস্পষ্ট মতামত তুলে ধরা হলো:

আমি ডা. ফেরদৌস খন্দকার বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী একজন চিকিৎসক। আমার বাবা ছিলেন বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা। মহান মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের বছর ১৯৭০ সালে তাকে বদলী করে পাঠানো হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। তখন বাংলাদেশের নামও ছিল পূর্ব পাকিস্তান। গোটা দেশটাই ছিল পাকিস্তান। যেমন ১৯৪৭ সালের আগে পাকিস্তান বলেও কোন দেশ ছিল না। পুরোটাই ছিল ভারতবর্ষ। আমার বাবার জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লার দেবিদ্বারের বাকশার গ্রামে। কেবল চাকরিসূত্রেই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে তাকে যেতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে আমার জন্ম হয় পাকিস্তানে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে সেখানে চাকরি সূত্রে যাওয়া অনেক বাংলাদেশির মতো আমাদের পরিবারকেও বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়। এরপর দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে বাবা মায়ের সাথে আমি একদম শিশু অবস্থায় আমার মাতৃভূমিতে চলে আসি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কোন ব্যক্তি সরকারি চাকরিসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানে থেকে থাকেন, তার সন্তানের জন্ম সেখানে হয়, এখানে কি কোন ভুল বা অপরাধ রয়েছে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, একজনের জন্ম কোথায় হবে, সেটা কি সেই ব্যক্তি নিজে নির্ধারণ করতে পারে? ষড়যন্ত্রকারীরা আশা করছি উত্তর দেবেন।

আমি পরিস্কার করে বলতে চাই; ১৯৭২ সালে এক বছরের শিশু হিসেবে বাংলাদেশে চলে আসার পর আর কোনদিন আমি পাকিস্তানে যাইনি। পাকিস্তানে আমার কোন আত্মীয় স্বজন নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে আমার এবং আমার পরিবারের কোন ধরণের যোগাযোগ ও সম্পর্ক নেই। আছে কেবল পাকিস্তানের প্রতি তীব্র ঘৃণা। কারণ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হায়নারা যে তাণ্ডব, হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন আমার প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি এবং তার মানুষের উপর চালিয়েছে; তাতে করে পাকিস্তানের প্রতি প্রবল ঘৃণাই কেবল জমা করে রেখেছি নিজের মনে।

সেই বানোয়াট খবরের ভেতরেই স্ববিরোধী কথা রয়েছে। তারা বলেছে, আমি নাকি পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে আমেরিকায় এসেছি। এটি বিরাট একটি মিথ্যা তথ্য। কেননা আমি বাংলাদেশি পাসপোর্টেই আমেরিকায় এসেছি।

তারা লিখেছে, আমি নাকি নিজের মামার নাম মোস্তাক হবার কারণে খুনি মোস্তাকের ভাগিনা সেজে পাকিস্তানি পাসপোর্টে আমেরিকায় পাড়ি দিয়ে শর্টকাটে নাগরিকত্ব নেয়ার চেষ্টা করেছি। এই কথাগুলোর মধ্যেই প্রমাণিত হয়, এই অনলাইন পোর্টাল কতটা জালিয়াতি করেছে। প্রথমত: কিছু দুষ্টু লোকের প্ররোচণায় পোর্টালটি প্রথম আমাকে “খুনি খন্দকার মোশতাকের ভাতিজা” বানিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট প্রচার করে। এখন তারা সেটা প্রমাণ করতে না পেরে অন্য খারাপ উপায় অবলম্বণ করছে। এখন বলার চেষ্টা করছে, “আমি নাকি নিজেই সেই খুনির ভাতিজা সেজেছি”। কত বড় প্রতারক তারা, ভেবে দেখুন।

দ্বিতীয়ত: আমি পারিবারিক চেইন ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে আমেরিকায় এসেছি। আমার বড় মামা বীর মুক্তিযোদ্ধা খুরশিদ আনোয়ারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমার পরিবার এখানে আসে। ফলে এখানে এসে কোন অ্যাসাইলাম কিংবা অন্য কোন উপায় আমাকে অবলম্বণ করার প্রশ্নই ওঠে না। তাই “আমাকে কেন শর্টকার্টে নাগরিকত্ব নেয়ার জন্যে পাকিস্তানি নাগরিক সাজতে হবে”? এই প্রশ্নটি আমি দুষ্টু লোকদের কাছে করতে চাই। সহজ করে বলি। আমি পারিবারিক চেইনে ভিসায় এসে প্রথমে গ্রিন কার্ড ও পরের ধাপে আমেরিকার পাসপোর্টধারী হই। আশা করি পরিস্কার হওয়া গেছে।

তাহলে এবার প্রশ্ন, আমার পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে কেন পাকিস্তানের কথা লিখা রয়েছে? এই উত্তরটিও দিয়ে রাখছি। আমেরিকার নাগরিক হওয়ার সময় শপথ নিতে হয়। সেই শপথে কেউ কোন মিথ্যা কথা বলতে পারে না। শপথ নেয়ার সময় আমি জাজের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আমার বাবা কর্মসূত্রে পাকিস্তানে থাকায়, আমার জন্ম হয়েছিল সেখানে। আমার কি করণীয় রয়েছে? তখন বিচারক বলেছিলেন, “অবশ্যই পাকিস্তান লিখতে হবে”। ফলে সেটা তখন লিখতে হয়েছিল। কিন্তু আমি বাংলাদেশের নাগরিকই ছিলাম। এরপরও যদি কেউ ষড়যন্ত্র করতেই থাকেন, তাহলে এই বিচারের ভাড় আমি মহান আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দিলাম।

আর একটি প্রশ্ন করতে চাই, “ধরুন এই মুহুর্তে বাংলাদেশের কোন কূটনীতিক কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের কেউ যদি চাকরিসূত্রে পাকিস্তানে থাকেন, আর সেখানে তাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলে তার জন্মস্থান কোথায় হবে”? এই প্রশ্নটিকে অন্যভাবেও ভাবতে পারেন, “ধরুণ অন্য কোন দেশে জন্ম হলো বাংলাদেশি কোন নাগরিকের সন্তানের, তাহলে ঐ শিশুর জন্মস্থান কোথায় হবে”? আমেরিকায় বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশি, যাদের সন্তানের জন্ম এখানে; তারা জন্মস্থান হিসেবে আসলে কি লেখেন? নিশ্চয় লেখেন ইউএসএ।

ধরুণ, এরপরও কেউ যদি তর্কের খাতিরে বিষয়টি তুলতে চান, তাহলে বলতে পারি, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ কলকাতায়। কেবল ভারতে নয়; এমন অনেক খ্যাতিমান বাংলাদেশিকে খুঁজলে পাওয়া যাবে, যাদের জন্ম পাকিস্তানে। কিন্তু তারা সবাই বাংলাদেশি। বিষয়টি তো সহজ। কেবল আমার ক্ষেত্রেই জটিল করা হয়েছে; ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে। আমি ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতি জানাচ্ছি তীব্র ঘৃণা ও প্রতিবাদ।

অভিযোগ যারা তুলেছেন, সেই হোতাদের পেছনে কারা আছেন; সেটা আমরা জানি। ওয়ান এলিভেনের সময় তাদের কি ভূমিকা ছিল, তাদের আয়ের উৎস কি, মানুষকে পণ্য বানিয়ে কারা ফায়দা লোটে; পৈশাচিক হাসি হাসে; তাদের তো চেনা আছে আমাদের। তারা মানবতার শত্রু; এমনকি দেশেরও। এই করোনাকালেইবা তারা কি করেছেন, মানুষকে কি সেবা দিয়েছেন, সবকিছু জানা আছে। নিজের জীবন বাজি রেখে আমি লড়াই করেছি করোনার বিরুদ্ধে। মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। আর এটাই কি তার প্রতিদান! আপনাদেরকে এতটা নিচে কেন নামতে হবে! আর কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠলে, তার বক্তব্য জানতে চাইতে হয়। মনগড়া কথা লিখে দিলেই সাংবাদিকতা হয় না। সাংবাদিকতার নাম দিয়ে মানুষের সম্মানহানী করেন, কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলনীতি কিংবা সৎসাহস তো দেখি না আপনাদের ভেতরে। তথ্য দিয়ে সন্ত্রাস করলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। যারা এই পেশার মহৎ ও সৎ মানুষ রয়েছেন, তাদেরকে এবং এই পেশাকে অসম্মানিত করে, এমন কিছু তথ্য সন্ত্রাসী।

দু:খের সাথে বলতে চাই, আমি একটা গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। সেই ষড়যন্ত্রকারীদের কালো হাত অনেক লম্বা। কিন্তু সত্যের কাছে মিথ্যা সবসময়ই পরাজিত হয়েছে; এই কথাগুলো কেবল সবাইকে মনে রাখতে হবে। আমার বিরুদ্ধে, এই অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র যদি চলতে থাকে, তাহলে আমি দেশে এবং আমেরিকায় দুষ্টুদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবো।
লেখাঃ-ডাক্তার ফেরদৌস