বাংলাদেশে শিল্প কারখানাগুলোতে ধর্মঘট ডাকা এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের বিধি শিথিল করার এক প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।

কোনো কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের জন্য ৩০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থনের শর্ত শিথিল করে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। আর ধর্মঘট ডাকতে হলে সমর্থন দরকার হবে দু-তৃতীয়াংশের পরিবর্তে ৫১ শতাংশের।

তবে অনেক শ্রমিক নেতা শ্রম আইনের এসব সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে খুশি নন।

তাদের কথা, বিদেশীদের চাপে কিছু পরিবর্তন আনলেও মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করা হচ্ছে।

তারা বলছেন, কোনো ট্রেড ইউনিয়ন গঠন শ্রমিকের মৌলিক অধিকার এবং কোনো শর্ত সেখানে থাকা উচিৎ নয়।

শিল্প কারখানায় ট্রেড ইউনিয়নের অবাধ অধিকারসহ শ্রমবান্ধব নীতি অনুসরণের জন্য শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও’র চাপ ছিল।

আইএলও সনদেও স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার।

শেষ পর্যন্ত সরকার কিছু বিষয় শিথিল করে শ্রম আইনের সংশোধনী প্রস্তাব এনেছে।

এখনকার আইনে কোনো শিল্প কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে কারখানাটির শ্রমিকদের ৩০শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়।

সেই সমর্থনের হার ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কারখানায় ধর্মঘট ডাকার ক্ষেত্রেও সেই কারখানার ইউনিয়নের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের মত গ্রহণের বিধান এখন আছে।

সেটিও কমিয়ে ৫১ শতাংশ সদস্যের মত গ্রহণের প্রস্তাব আনা হয়েছে।

এই দু’টি সংশোধনী প্রস্তাবকে বিশেষভাবে তুলে ধরছে সরকার।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বলছিলেন, শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষায় তারা শ্রম আইন সংশোধন করছেন।

“শ্রমিকের অনেক সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আইনের এসব সংশোধনী প্রস্তাব শ্রমবান্ধব।”

কারখানায় দুঘর্টনায় শ্রমিকের মৃত্যু বা আহত হওয়ার ব্যাপারেও ক্ষতিপূরণ দ্বিগুণ করার প্রস্তাব এসেছে।

কোনো শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

আহত হয়ে স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে তার জন্য ক্ষতিপূরণ এক লাখ ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে আড়াই লাখ টাকা করা হচ্ছে।

শ্রমিকদের আরও কিছু সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু শ্রমিক নেতাদের অনেকে সন্তুষ্ট নন। একজন শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু বলছিলেন, এসব বিধান করে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

“এটা হলো যে নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।কিন্তু আমরাতো কানা মামা দাবি করি নাই। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের জন্য শ্রমিকের সমর্থনের হার যদি ৩০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে আনে, এটা বড় কোনো পরিবর্তন বলে আমরা মনে করি না। বরং সংবিধানের যে অধিকার, সেখানে কেন বার বা শর্ত থাকবে?”

“ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে আমরা এক জীবনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ চেয়েছি। সেখানে মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ এক লাখ থেকে দুই লাখ করলে, সেটাতো হাস্যকর।”

বাংলাদেশে শিল্পখাতের মধ্যে বিশেষভাবে তৈরি পোশাক শিল্পে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের।

২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন করে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দেয়া হয়েছিল। কারখানায় শ্রমিকের ৩০ শতাংশের সমর্থনের বিধান আনা হয়েছিল।

কিন্তু শ্রমিকরা অভিযোগ করে আসছেন, সেই আইনের পরও অনেক গার্মেন্টস কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের হয়রানি পোহাতে হয়েছে।

শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা বিলস এর কোহিনূর মাহমুদ বলছিলেন, সরকারের এখনকার সংশোধনী প্রস্তাবে মালিকের স্বার্থই বেশি দেখা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

“ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে শ্রমিকের সমর্থনের হার কিছুটা হয়তো কমিয়ে আনা হযেছে, সেখানে কিছুটা উন্নতি হতে পারে।কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করাটাই মুল পারপাস না।ট্রেড ইউনিয়ন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে,তাহলে কিন্তু এটা আমাদের ব্যর্থ হয়ে যাবে।তারপরও মনে হয়, আইনের যতটুকু উন্নতি হয়েছে, এটা মনে হয়, সরকার এটা করুণা করে দিচ্ছে।মানে সরকার দিচ্চে মারিকের পরামর্শে।”

গার্মেন্টস খাত থেকেই শ্রমিকের অধিকার বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ বেশি আসে, সেই শিল্পে এখন পর্যন্ত পাঁচশ’র বেশি কারখানায় টেড ইউনিয়ন গঠন হয়েছে বলে মালিকরা দাবি করছেন।

ব্যবসায়ীদের প্রধান সংগঠন এফবিসিসিআই এর প্রেসিডেন্ট সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছেন, শ্রমিকের অধিকার নিয়ে শিল্প মালিকদেরও মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

“কালেক্টিভ বার্গেনিং যদি হয়, তাহলে একটা প্লাট ফরম তৈরি হয়, যেখানে স্ট্রাকচারাল ওয়েতে আলোচনা করা যায়।আমাদের ইতিমধ্যে পার্টসিপেশন কমিটিগুলো হয়েছে, আমরা চাই, সেগুলো আস্তে আস্তে ট্রেড ইউনিয়নে রুপান্তরিত হোক।এতে আমাদেরও সুবিধা হবে যে কোনো সমস্য হলে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের সাথে আলোচনা করা যাবে।”

এদিকে, এখন আইনে অনুযায়ী কারখানায় ১২ বছরের শিশুদের দিয়ে হালকা কাজ করানো করানো যায়।

সেই বয়সসীমা বাড়িয়ে ১৪ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কোনো কারখানার মালিক ১৪ বছরের নীচে শিশুকে কোনো কাজে নিয়োগ করলে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ডের বিধান আনা হচ্ছে।