মহিমা

0
17

রোজ ভোরে উঠেই প্রকৃতির সাথে কিছুক্ষন সময় কাটাই, পাখিদের সাথে কথা বলি গাছেদের সাথে কথা বলি৷ আমার মনে হয় ওরাও আমার সাথে কথা বলে আনন্দ পায়, সুন্দর একটা মূহুর্ত দিয়ে দিনের শুরু করতে ভালো লাগে৷

আমি মহিমা, ছোটবেলায় বাবা-মা কে হারিয়েছি৷ প্রথমে তো আমার খালার কাছে ছিলাম, কিন্তু খালু আর খালাতো বোনেরা আমাকে ভীষন অপছন্দ করতো, তাই খালা আমাকে এতিমখানায় পাঠিয়ে দেয়৷ সেখান থেকে একদিন হঠাৎ এক মধ্যবয়স্ক ধণী মহিলা আসলেন৷ এসেই আমাকে এডপট করার প্রস্তাবনা দেন৷ মহিলাকে দেখে বেশ ভদ্র আর মিতভাষী মনে হলো৷
তার বিশাল অট্টালিকা যে আছে তা নয়, সুন্দর একটা দোতালা বাড়ি৷ বিশাল বারান্দা সামনে সবুজ মাঠ আর অনেক গুলো বড় বড় গাছ৷ বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ৷ বাড়িতে দারোয়ান ছাড়াও আরো একজন মহিলা রয়েছেন, যে ঘরের বাকি কাজ দেখা শোনা করেন৷ আমাকে যে রুমে থাকতে দেয়া হলো, সেটার সাথেও অনেক বড় বারান্দা ,পাশে অনেক সুন্দর পুকুর, পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে আর ফুলের গন্ধে রুমটা অদ্ভুত ভাবে ভালো লাগতে শুরু করলো৷
আমি নিজেকে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে লাগলাম, এ বাড়িতে মানুষ কম হলেও সব কিছু অনেক নিয়ম – শৃঙ্খলের মধ্যে চলে৷

১০ বছর পার হয়ে গেছে; আমি ওনাকে ‘বড় মা’ ডাকি, ওনার আসল নাম এ্যানা গোমেজ৷ জন্ম হয়েছিলো ব্রাজিলে ,তার বাবা মায়ের ডিভোর্সের পর বাবার সাথে বাংলাদেশ চলে আসেন৷ এই বাড়িটা সে পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন, কখনো বিয়ে করেন নি৷ লেখাপড়ার পাশাপাশি পৈতৃক ব্যবসা সামলাচ্ছিলেন৷ আমাকে দত্তক নেয়ার একটাই কারন ছিলো তিনি মা হওয়ার স্বাদ ভোগ করতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু কোন পুরুষের প্রতি আস্থা নেই, তাই এতিমখানা থেকে আমাকে দত্তক নিলেন৷ আমার কখনও কোনো কিছুতে সে কমতি রাখেনি৷ যখন যা চেয়েছি পেয়েছি৷ আমাকে সে নিজ দায়িত্বে সব শিখিয়েছেন৷ এটাও বলেছিলেন, কখনো যেনো ভালোবাসার সম্পর্কে না জড়াই৷

আমি, বড়মায়ের আদেশ মতে চলতাম, আমার দুনিয়া বলতে তখন শুধুই বড়মা আর এই বিশাল বাড়িটা৷ বড়মা বলেছেন তার মৃত্যুর পর এ সব কিছু আমার, কিন্তু আমি ভাবছিলাম তার মৃত্যুর পর আমার আপন বলতে কি রইবে?

প্রতিবেশিদের কাছে আমাদের এ বাড়িটা রহস্যজনক , বড়মা সমালোচনা আর বাড়তি কথা অপছন্দ করেন বলেই দারোয়ান কে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যেনো আশে পাশের মানুষজন এখানে না ঢুকতে পারে৷ শুধুমাত্র তার ব্যবসায়িক আলোচনার ক্ষেত্রে এ্যপোয়েন্টমেন্ট নেয়া ক্লাইন্টরাই আসতে পারে৷ আমাকেও সে তার কাজ শিখিয়ে দিচ্ছেন৷

সপ্তাহে একদিন বাজারে যাই প্রয়োজনীয় বাজার করে ফেলি সব৷ আমার সাথে এখানের আসে পাশে সবাইর বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে৷ মানুষের সাথে বেশি মেলামেশা করা নিষেধ সত্বেও আমি সবার সাথে মিশা শুরু করে দিয়েছি৷ সবাই আমাকে বেশ পছন্দ করে৷
মাঝে মাঝে পাড়ার কিছু আন্টি সবজি কিনতে গেলে বিয়ের প্রস্তাবও দেয়৷ আমি আগে কখনও এসব নিয়ে ভাবিনি, কিন্তু এখন শুনলে খুব লজ্জা পাই৷

এক সকালে বের হয়ে ভাবছিলাম কফি শপে যাবো, একা একা চলে গেলাম৷ কিছুক্ষন পরই আমার অপর পাশের টেবিলে একটা ছেলে এসে বসলো, সাদা শার্ট, গারো নীল জিন্স৷ একটা মানুষকে সাদা কাপড়ে এতোটা সুন্দর লাগে!!
অসাধারন গঠন আর কি সুন্দর ঘন কালো চুল৷ সেকি আমি তো চোখ ফেরাতে পারছিনা অথচ ছেলেটা আমার দিকে একটাবারও তাকাচ্ছেনা৷ সে তার কফিটা শেষ করে বিল দিয়েই চলে গেলো৷

সারাদিন কাজের মাঝেও তাকে ভুলতে পারছিনা, একি হলো আমার!

পরেরদিন আমি আবারও গেলাম একই সময়ে শুধুমাত্র তাকে একটু দেখার জন্য৷ সে আজকেও সাদা শার্ট পরেছে তবে আজকে টাই বেঁধেছে৷ কি নাম এই সুদর্শনের, কোথায় থাকে সে?? না না রকম প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিলো৷ অদ্ভুত একটা ছেলে আশে পাশে একটুও তাকায় না, কেউ যে তার অপেক্ষায় বসে আছে দেখছে না৷
ইচ্ছে হচ্ছে নিজে যেয়ে কথা বলি, কিন্তু না থাক যদি আমাকে ভুল বুঝে!

আমি কখনও কালো রঙয়ের বাহিরে কোন কাপড় পড়তাম না, আজকাল সাদা রঙয়ের কাপড় পড়া শুরু করে দিলাম৷ সাদা রঙ টা এতো প্রিয় হয়ে যাবে ভাবিনি৷

১৫ দিন হয়ে গেলো মানুষটাকে একই সময় ধরে দেখছি, আমাকে কি সে দেখেনা ,নাকি না দেখার ভান করে থাকে!
আজ শুক্রবার, আজ নীল রঙয়ের একটা শাড়ি পরেছি, একটা বইয়ে পড়েছিলাম ছেলেরা নাকি নীল রঙয়ের শাড়িতে মেয়েদেরকে খুব পছন্দ করে৷

কিন্তু আজ অনেকটা সময় পার হয়ে গেলো সে আসলো না, মনে হচ্ছে আজ আর আসবেনা৷ যেই উঠে চলে যেতে নিলাম হঠাৎই একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা লাগলো, মেয়েটার হাতে অনেক গুলো গোলাপ ছিলো পরে গেলো মাটিতে৷

“আমি সত্যিই দুঃখিত দেখতে পাইনি, ক্ষমা করবেন, এই নিন আপনার ফুল”

“না না আপনার কোনো দোষ নেই আমিই খ্য়াল করিনি, অন্যমনস্ক ছিলাম,আজকে আমার হাসব্যান্ডের জন্মদিন তো তাই তাড়াহুড়ায় আছি একটু”

“শুভ কামনা রইলো আপনাদের জন্য,আসি”

কেউ একজন ডাক দিয়ে উঠলো “তারাতারি এসো জেনী, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে”

পিছন ফিরে তাকাতেই যা দেখলাম তারপর তো আমার মনের মধ্যেই ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে৷
(১ম পর্ব)

লেখা-হৃদিতা তাহ্সীন৷