রাফিদা খান রাইফা। ফুটফুটে, আদুরে। দেখলেই আদর দিতে ইচ্ছে করবে। গলায় সামান্য ব্যাথা হচ্ছিলো। ধারণা ছিলো- টনসিল হতে পারে। একদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতরাত ৯টায়ও দিব্যি হেসে খেলে বেড়োচ্ছে রাইফা। এরপর একটি এন্টবায়ােটিক পুশ করা হয়। ছটফট শুরু করে সে। দাঁতে দাঁত কামড়ে খিঁচুনি দিতে গিয়ে একটি দাঁত ভেঙ্গে যায়। রক্তাক্ত হয় শিশুটি। কিছুক্ষণ পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
২.
প্রতিটি কন্যা সন্তানই একজন বাবার কাছে রাজকন্যা। আর সেই রাজকন্যার লাশ যখন বাবার কোলে নিতে হয়, এর চেয়ে ভারী আর কী হতে পারে ? কিন্তু রুবেল ভাই কোলে নিয়েছেন, কবরে শুইয়েছেন, প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। আজ সকালে যখন লাভ লেইনের বাসা থেকে রাইফার নিথর দেহ কোলে নিয়ে তার বাবা বের হয়ে আসছিলেন, তখন রাইফার মায়ের গগনবিদারি চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আসছিলো। তিনি শুধু বলছিলেন, ‘আমার জানটাকে তোমরা নিয়ে যেওনা। আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না।’ ঠিক সেই মূহুর্তে কী অনুভুতি হয়েছিলো তা বলার ভাষা আমার নেই। রুবেল ভাই ও ভাবী কিভাবে সেই শোক সইবেন তা ভাবতেই গা হিম হয়ে আসছে।
৩.
এবার বলি গুন্ডার গল্প। রাত ১টায় সিইউজে প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি, প্রেসক্লাব প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি, বিএফইউজে ভাইস প্রেসিডেন্ট, যুগ্ন মহাসচিবসহ অন্তত ৫০ জন সাংবাদিক ম্যাক্স হাসাপতালে যায়। তারা যাওয়ার আগেই রাইফার চিকিৎসার মূল ফাইল গায়েবের চেষ্টা করে দায়িত্বরত সুপারভাইজার। আমরা গিয়ে সেটা খুঁজে বের করি। এরমধ্যে পুলিশ আসে। দায়িত্বরত সুপারভাইজার, এন্টিবায়োটিক পুশ করা নার্স ও কর্তব্যরত ডাক্তারকে এক জায়গায় এনে পুলিশের সহায়তায় চকবাজার থানায় পাঠানো হয়। সঙ্গে যাই আমরাও।
৪.
চকবাজার থানায় চেয়ার সংকটে আমাদের অনেকে দাঁড়িয়ে থেকেও অভিযুক্ত ডাক্তার, নার্স ও সুপারভাইজারকে বসতে দেয়া হয়। সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে তাদের সঙ্গে আচরণ করা হয়। এরমধ্যে ওসি আসেন। সবাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়, একটি তদন্ত কমিটি করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দিয়ে পুরো ঘটনা বিস্তারিত তদন্ত করে আজ সকালে মামলা কিংবা অভিযুক্তদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৫.
রাত প্রায় তিনটা। ওসির কক্ষে প্রবেশ করেন এই শহরের নয়া মাস্তান ফয়সাল ইকবাল। যিনি একাধারে ডাক্তার ও ডাক্তারদের নেতা! তাঁকে দেখে আমরা প্রথমে কিছুটা আশান্বিত হই এ কারণে যে- তিনি আসার ফলে অভিযুক্তদের খুঁজে বের করতে আরো সহজ হবে। কিন্তু ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই সে ধারণা পাল্টে গেলো। ওসির সাথে যাস্ট হ্যান্ডশেক শেষেই তিনি পুলিশকে চার্জ করলেন। কেনো তারা ওই তিনজনকে থানায় আনলেন। তিনি চাইলে এক ঘন্টার মধ্যে চট্টগ্রামের সব হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে পারেন। হুমকি দিলেন- সাংবাদিকদের চিকিৎসা বন্ধ করে দিবেন।
৬.
হাও ডেয়ার ইউ মিস্টার ইকবাল ! আন্দরকিল্লার খুঁটির জোরে আপনি কি সবকিছুর উর্দ্ধে উঠে গেলেন ? এই কী আপনার নেতৃত্বেও গুনাবলী। মাস্তানি করা ? গুন্ডামি করা ? আমি উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- ‘আপনি কার বাচ্চা মারা গেলো একটিবার সেটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করলেন না। আপনি কিসের নেতা হলেন ভাই। আর কিছু না জেনে বুঝে এমন আচরণ করলেন ? তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি কী ওই সাংবাদিককে চিনি নাকি ?’ এই হলো নেতার গুনাবলী ! অথচ- পৃথিবীর সব দেশেই সবচেয়ে মহৎ পেশাটির নাম ডাক্তারী করা। আর বাংলাদেশের গুটিকয়েক ডাক্তার বাদে বাকীদের আচরণ, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের ধারণা তো আছে। অবশ্য ওইসব ডাক্তারদের ভোটে (ভোট কিভাবে হয়েছিলো সেটাও আমাদের চোখের দেখা) নির্বাচিত হলে এমন গুন্ডামি আপনি করতেই পারেন।
৮.
এই ম্যাক্স হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। প্রথমত- বিতর্কিত জায়গায় প্রভাব খাটিয়ে এই হাসাপাতাল গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ আছে। আর হাসপাতালটির শুরু থেকে এ পর্যন্ত বেশকিছু বির্তর্কের ঘটনা আছে। জীবিত নবজাতককে মৃত ঘোষণা, ভুল চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুসহ বেশকিছু অভিযোগ উঠেছে। আবার এরকম অনেক অভিযোগ প্রকাশ্যেও আসেনা। কিছুদিন আগে এক নারী অভিযোগ করলেন- তার গর্ভের পাঁচমাস বয়সী নবজাতক ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে। তিনি একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য আমার কাছে আসলেন। ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি হু হু করে কেঁদে ফেললেন। কিন্তু তিনি এমন কোনো ডকুমেন্ট দিতে পারলেন না যেটি দিয়ে একটি স্টোরি দাঁড় করানো যায়। এরপরও আমি অভিযুক্ত ডাক্তারের কাছে গিয়ে কথা বলেছি। তিনি খুব চমৎকারভাবে পুরো ঘটনার দায় ওই নারীর উপর চাপালেন। আজ এই ঘটনার পর আমাকে একাধিক ব্যাক্তি ফোন করে বললেন, ‘এই ঘটনা নতুন নয়। আজ হয়তো আপনাদের বাচ্চা মারা গেছে বলে আপনারা প্রতিবাদ করতে পারছেন।’ অন্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেগুলো হাসপাতালেই চাপা দেয়া হয়।
৯.
আবার আসি মাস্তানের গল্পে। লোকজন বলে- এই মাস্তান একাধারে চাঁজাবাজ, ত্রিপল মার্ডারের আসামী, নিয়োগ বাণিজ্য ব্যবসায়ী, মেডিকেল ঠিকাদার, হাসপাতালের ডিম থেকে ওষুধ সবই তিনি সরবরাহ করেন। এর আগে অসংখ্য ঘটনায় এমন ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ করেছেন। কিন্তু খুঁটির জোরে বেঁচে গেছেন। আর প্রতিটা ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়ে দিন দিন তিনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন। কথা হলো- এদেশে যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, সাংবাদিক, আইনজীবি, রাজনীতিবীদ এমন কোন পেশা আছে যে পেশার লোককে অপরাধের অভিযোগ উঠলে আটক কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না ? নাকি আমরা শালীন প্রতিবাদে বিশ্বাসী বলে, ভাংচুর জানিনা বলেই আমাদের এই পরিণতি?
লেখকঃ
আযহার মাহমুদ।