প্রহর
শাহরিয়ার ফারজানাFB_IMG_1464690162020FB_IMG_1464690154989

সারাটি বিকেল টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। শ্যামল বৃক্ষের পাতাগুলো এদিক ওদিক হেলেদুলে যে অপরুপ নৃত্যনাট্যের সূচনা করে তার তূলণা মিলে কই! বাড়ির পাশের কুয়োটাতে ব্যাংগুলো আজ যেন নব জীবন লাভ করেছে। কণ্ঠে তাদের বর্ষা বন্দনা।

মাঝে মাঝে যখন বাতাস থেমে যায় তখন প্রকৃতিকে নীরব নিঝুমপুরীর মতো মনে হয়।ঘরের চালা বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা মেঝের উপর এসে পড়ছে। প্রকৃতি যেনো অঝোর নয়নে কাঁদছে। কি এক গোপন আক্রোশে ফেটে পড়তে চায়। তবুও সেদিকে মন দিয়ে এতটুকু চিন্তা করার ফুরসত কারো না মিললেও মাহির কিন্তু এটুকু সময়ের অভাব নেই। তাই সে খুঁটিতে ঠেস দিয়ে তার আটচালার দাওয়ায় বসে আছে।আনমনে বোবা দৃষ্টি নিয়ে প্রকৃতির দিকে চেয়ে আছে।
সে চাহনীর অর্থ এই নয় যে- কি চেয়েছিলাম আর কি পেলাম? প্রকৃতির এই নীরবতা ও ধ্যানমগ্নতা তার বড়ই পছন্দ। কিন্তু কেন ? প্রকৃতির কাছে কি তার কোন নালিশ আছে? আছে বৈকি। নতুবা এই করূণ চাহনীর অর্থ কি? যে নারী কোলাহলের মাঝে খুঁজে পেতো জীবনের আস্বাদ, কোলাহল বিণে যার একাকী থাকা দুর্বিষহ লাগতো, তার মধ্যে পাষান মূর্তি কেন ? হৈ চৈ উচ্ছাসে মত্ত থাকা যার স্বভাব তার আবার ধ্যান তৎপরতা কিসের? যতোই অর্থহীন অপলক দৃষ্টিতে বাহিরের দিকে চেয়ে আছে, ততোই তার সামনে ভেস উঠে সেই দিন, সেই বেলা, শেফালী ফুলের গাছ, আর সেই সব কিছুর মূলেই নাহিদ।
মাহীর জীবনের সবচে’ প্রিয় বন্ধু, যার হাত ধরে তার ভালোবাসার পথ চলা শুরু হয়েছিল। নাহিদকে যেদিন থেকে হারালো সেদিন থেকে সে এমনি নিশ্চুপ। মান-অভিমানে ভরা সেই মধুময় দিনগুলোর কথা চিন্তা করতে করতে মাহী অনেকটা অস্থির হয়ে পড়ে। শব্দ করে কাঁদতে চায়, কিন্তু পারেনা। সে বড়ই দুর্বল – বড়ই অসহায়। শুধু তার তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কপোল বেয়ে।এখন অশ্রুই তার একমাত্র সান্ত্বনা। তাকে সান্ত্বনা দেয়ার আর যে কেউ নেই।অশান্তির সমুদ্র মন্থন করার জন্যই কি সে এমনি কেঁদে কেঁদে নিজেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে? নির্ঝরিনীর মতো কাঁদতে কাঁদতে সে পায় শান্তি। মহাশক্তি সমুদ্র তবুও মন্থিত হয় না। শেষে সে উঠে দাঁড়ায়। ঘনায়মান সন্ধ্যা্য দীপ্তমান সূর্যটি ঢাকা পড়ে গেছে– একথা বুঝতে তার বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না।তাকে অনেক কাজ করতে হবে রাতের অন্ন সংস্থান করতে হবে। তাই সে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় আটচালার দিকে। রান্না ঘরে একটু বিশ্রাম নিয়ে খেতে বসে একাকী। নাহিদের চলে যাওয়ার পর থেকে সে একাকীই খায়। জীবনে নতুন করে কাউকে আসার সুযোগ সে দিতে চায় না। নানান জন নানা ভাবে চেষ্টা করে মাহীর সুখ দুঃখে পাশে এসে দাঁড়াতে। দুর্বলতার প্রশ্রয় সে দিতে পারতো, যদি না নাহিদ তার জীবনে অমনি করে না আসতো।
নাহিদের হাত ধরেই তার স্বপ্নময় পথ – তার জীবনের স্বর্গ সুখ ছিল নাহিদের ভালোবাসায়। ওর ভালোবাসার মাঝেই ছিল বেঁচে থাকার অংগীকার। নাহিদ নাই বিধায় লক্ষ্যহীন পথ চলা। লক্ষ বিহীন জীবনে প্রতিনিয়ত নিরাশার হাতছানি। নতুন করে কাউকে নিয়ে স্বপ্ন সাজে আবদ্ধ হতে চায় না মাহী। তাই অন্য কারো প্রস্তাব তার কানে গেলে, সে বড়ই শূন্যতা অনুভব করে। এই শূণ্যতা পূরণ করার জন্য সে অনেক সময় সাহস ভরে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখনি মনে পড়ে নাহিদের কথা – তার সুখকর মুহুর্তগুলো তখনি পিছু হঠতে বাধ্য হয়। অমনি করে এলোমেলো ভাবতে ভাবতে খাওয়াও শেষ হয়ে আসে তার। ক্লান্তিতে ভরা কোমল দেহ খানি এলিয়ে দেয় বিছানায়। গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে হারিয়ে যায় কল্পনার স্বপ্ন রাজ্যে। কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় তার সমস্ত ব্যাথা বেদনার কথা। স্বপ্ন দেখে নতুন করে – কতো মধুর সে স্বপ্ন। নাহিদ স্বর্গ থেকে নেমে এসে মাহীর পাশে বসে। মান-অভিমানের ক্ষুধার্থ মনটা ভরিয়ে দেয় হাসির উচ্ছাসে। ভোরের পাখীর কিচির মিচির শব্দে ঘুম ভাংগে মাহীর।পলকেই ভেংগে চুরমার হয়ে যায় তার সুখ স্বপ্ন। পথ হারা পথিকের মতো শুধু অপেক্ষাই প্রহর।
(সংগ্রহ)

Advertisements