14364669_1121170634603979_2700798559702822594_nবঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল (অব) এসএইচ নূর চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আপীল আবেদন বাতিল করে তাকে কানাডা থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির ফেডারেল কোর্ট। বর্তমানে নূর চৌধুরী কানাডায় অবৈধভাবে বসবাস করছেন। এখন ইচ্ছা করলে কানাডা সরকার যে কোন মূহুর্তে দেশ থেকে বের করে দিতে পারে।

কানাডার আদালতের এ আদেশে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, আইনী লড়াইয়ে হেরে গেছেন নূর চৌধুরী। এখন কানাডা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই তাকে দেশে আনা হবে। এতদিন আমরা আইনী লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষা করেছি।

সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেছেন, আইনী লড়াইয়ে নূর চৌধুরী হেরে গেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমাদের আবেদন গ্রহণ করে কানাডা আত্মস্বীকৃত খুনী নূর চৌধুরীকে দেশে পাঠাতে পারে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল সদস্য ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হানা দিয়ে বেশ কয়েকজন আত্মীয়স্বজনসহ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। নিহত হন বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে রাসেলসহ মোট ২৮ জন। সেদিন ৩২ নম্বর বাড়ির নিচতলা ও দোতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি অবস্থান নিয়ে বজলুল হুদা ও নূর চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে স্টেনগানের গুলিতে হত্যা করেন।

১৯৯৬ সালের জুনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার মুহূর্তেই খুনী নূর চৌধুরী সপরিবারে কানাডায় পালিয়ে যান। কানাডায় গিয়ে ফেড়ারেল কোর্টে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনে নূর চৌধুরী নিজেকে চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা ও অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। আবেদনে বঙ্গবন্ধু সরকারের কুৎসা আর জিয়াউর রহমানের প্রতি নিজের সমর্থন ও যোগসাজশের কথা উল্লেখ করেছেন নূর চৌধুরী।

কানাডার নিম্ন আদালত বাংলাদেশে তার অপকর্মের কথা উল্লেখ করে আবেদনটি বাতিল করে দেয়। এর পর খুনী নূর চৌধুরী উচ্চ আদালতে আপীল করেন। উচ্চ আদালতের বিচারপতি জেমস রাসেল তার আপীল বাতিল করে কানাডা থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে স্বচ্ছতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানি ও বিচার হয়েছে। আসামি সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও নূর চৌধুরীর পক্ষে আইনজীবী যথেষ্ট আইনী লড়াইয়ের সুযোগ পেয়েছেন। ফলে দেশে সুবিচার মিলবে না, নূর চৌধুরীর এমন দাবি ঠিক নয়।

ফেডারেল আদালত আরও বলেছে, ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু হত্যার মুহূর্তেই সেনা চেকপোস্ট পেরিয়ে নূর চৌধুরীর অবারিত যাতায়াত সন্দেহ জনক বলে মনে করা হয়। বিচারপতি নূর চৌধুরীকে কানাডায় থাকার অযোগ্য উল্লেখ করে বলেন, ওই রাতে নিরীহ জনগণ, নারী-শিশুর ওপর যে পরিকল্পিত সুসংঘটিত হামলা হয়েছে সে ষড়যন্ত্রে নূর চৌধুরীর যুক্ত থাকার সম্ভাবনা সন্দেহের উর্ধ্বে।

গত শুক্রবার (১৬ সেপ্টেম্বর) হায়াত রিজেন্সি মন্ট্রিয়লে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মধ্যে বৈঠকে নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার উপায় বের করতে মতৈক্য হয়। এখন কানাডার আদালতে আইনী লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর বিষয়টি আরও এগিয়ে গেছে।

এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, আমি যখন আইনমন্ত্রী ছিলাম তখন থেকেই নূর চৌধুরীকে দেশে আনার জন্য চেষ্টা চালানো হয়। তার পাসপোর্ট সিস করা হয়েছিল। যেহেতু নূর চৌধুরী আদালতে আশ্রয় নিয়েছিল, সে কারণে কিছু করা যায়নি। আইনী লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর বর্তমানে কানাডা সরকার ইচ্ছা করলে তাকে দেশে পাঠাতে পারে। এজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কানাডা সরকারও চাচ্ছিল এমন একটি পন্থা বের করতে, যাতে নূর চৌধুরীকে দেশে পাঠানো যায়। আমার মনে হয় এখন সে বাধা দূর হয়েছে।

সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেছেন, আইনী লড়াইয়ে নূর চৌধুরী হেরে গেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমাদের আবেদন গ্রহণ করে কানাডা আত্মস্বীকৃত খুনী নূর চৌধুরীকে দেশে পাঠাতে পারে। কানাডার সঙ্গে আমাদের বন্দী বিনিময় চুক্তি নেই। এখন কানাডা সরকার কী পদক্ষেপ নেয় সেটা দেখতে হবে।

উল্লেখ্য, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে ছয়জন বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। পলাতকরা হলেন- কর্নেল (অব) খন্দকার আব্দুর রশিদ, লে. কর্নেল (অব) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব) এএম রাশেদ চৌধুরী, রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, লে. কর্নেল (অব) এসএইচ নূর চৌধুরী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল মাজেদ।

ইতোমধ্যে ১২ খুনীর মধ্যে পাঁচ খুনীর ফাঁসির রায় কার্য়কর হয়েছে। তারা হলেন- লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (অব) মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি) ও লে. কর্নেল (অব) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)।