গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ছয়জনের ফাঁসির রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- যুবদল নেতা নুরুল ইসলাম সরকার, নূরুল ইসলাম দীপু, মাহবুবুর রহমান, শহিদুল ইসলাম শিপু, হাফিজ ইলিয়াস ওরফে কানা হাফিজ ও সোহাগ ওরফে সুরু। এ ছাড়া নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির দণ্ড কমিয়ে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ আহমেদ মজনু, আনোয়ার হোসেন আনু, রতন মিয়া ওরফে বড় রতন, জাহাঙ্গীর ওরফে কাশেম মাতবর, আবু সালাম ও মশিউর রহমান।
এ ছাড়া বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত নুরুল আমিনের রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এদিকে নিম্ন আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত অহিদুল ইসলাম টিপু রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করায় কোনো সিদ্ধান্ত দেননি হাইকোর্ট। তবে আইনজীবীরা জানান, যেহেতু আপিল করেননি সেহেতু তার যাবজ্জীবনই বহাল থাকবে। এ ছাড়া হাইকোর্ট বাকি আসামিদের সাজা মওকুফ করে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। তবে দুজন আসামি হাইকোর্টে বিচারাধীন থাকাবস্থায় কারাগারে মারা গেছেন। তারা হলেন- আল-আমিন ও ছোট রতন। মারা যাওয়া দুজনই বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। এ মামলায় ২০০৫ সালে নিম্ন আদালতে দণ্ড পাওয়া বাকি ২২ আসামির মধ্যে আটজনকে হাইকোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ ও রোনা নাহরীন। বাদীপক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম, আবদুল মতিন খসরু। অপরদিকে আসামিপক্ষে আপিল শুনানিতে অংশ নেন বিচারপতি টি এইচ খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এ জে মোহাম্মদ আলী।
দুবারের সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারকে বিএনপি জোট সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ৭ মে দুপুরে একদল সন্ত্রাসী টঙ্গীর নোয়াগাঁও এমএ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। হত্যার ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মতিউর রহমান মতি বাদী হয়ে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে দ্রুত বিচার আইনে টঙ্গী থানায় মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজের সে সময়ের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম দীপুকে। এ ছাড়া এজাহারে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় শিল্পবিষয়ক সম্পাদক নূরুল ইসলাম সরকারকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সে সময়ের সহকারী পুলিশ সুপার মো. খালেকুজ্জামান প্রায় দুই মাস তদন্ত শেষে ৩০ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। এই মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুরুদ্দিন ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিচারক প্রধান আসামি নূরুল ইসলাম দীপু ও যুবদল নেতা নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুজনকে খালাস দেয়া হয়।
ওই বছরই আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। ২০০৯ সালের নভেম্বর আপিলের শুনানি শুরু হয়। তিন দিন শুনানির পর আপিলটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে বিচারপতি আবু তারিক ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুনানি চলাকালে ২০১০ সালের ৭ জুলাই আপিলটি সে সময়ের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। এভাবে পার হয়ে যায় প্রায় সাত বছর। অবশেষে ১৪ জানুয়ারি থেকে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের বেঞ্চে এই মামলার আপিল শুনানি শুরু হয়।
এক নজরে আহসানউল্লাহ মাস্টার : গাজীপুর-২ (গাজীপুর সদর-টঙ্গী) আসনে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আহসানউল্লাহ মাস্টার। এর আগে ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সালে দুদফা পূবাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক লীগের সভাপতি। এ ছাড়া তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
একটি আদর্শকে হত্যা করা হয়েছে বলেন আদালত।হহ