আমি চিৎকার
করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার !
বুকের
ব্যাথা বুকে চাপিয়ে নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার !!
নৃশংস ২১ আগস্ট,
রক্তাক্ত ২১ই আগস্ট,
খুনিদের ক্ষমা নেই, ক্ষমা নেই,
আজ সেই ভয়াল ২১ই আগস্ট,
স্মরনকালের ভয়াবহতম বর্বরোচিত
হত্যাকান্ড,
জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার এক
অপচেষ্টা।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামীলীগ এর
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী প্রতিবাদ
সমাবেশে সরকারী পৃষ্ট পোষকতায়
চালানো হয় বর্বরোচিত জঙ্গি হামলা ।
আল্লাহর অশেষ রহমতে দয়ায় শেখ
হাসিনা বেঁচে গেলেও প্রাণ
দিতে হয়েছে আইভি রহমানের মত নেত্রী সহ
২৪ জন নেতা কর্মীকে ।
একুশে-ই আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত
শহীদের আত্মার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা___

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫-
এর ১৫ আগস্টের কালরাতের বর্বরোচিত হত্যাকন্ডের পর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘাতকের ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় নৃশংস আরেকটি হত্যাকাণ্ড ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় বর্বরোচিত ও বহুল আলোচিত গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জনের নির্মম মৃত্যু হয়। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের প্রথমসারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এ ঘৃণ্য হামলা চালানো হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আহত হন, তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রেনেডের স্পিন্টারের আঘাতে আহত হন কয়েক শতাধিক মানুষ।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট : ২০০৪ সালের সারাদেশে জঙ্গিদের বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২১ আগস্ট বিকেলে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকেল ৫টায় পৌঁছালে, একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসতে থাকেন। ঠিক এমন সময় শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন।
এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহতরা হলেন সাবেক রাষ্টপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমান, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া।
শুধু গ্রেনেড হামলায় নয়, বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য তার গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হয় ছয় রাউন্ড গুলি। গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গাড়িতে তোলার সময় গুলিতে নিহত হন তার ব্যক্তিগত সহকারী মাহবুব আলম। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় শেখ হাসিনাকে বহনকারী বুলেট প্রুফ গাড়িটি। গ্রেনেড হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মক আহত হন তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।
গ্রেনেডের স্পিøন্টারের আঘাতে আহত হন আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতাকর্মী। আহত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অনেকে এখনও স্পিøন্টারের আঘাত নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাচ্ছেন। সেদিন যারা আহত হয়েছিলেন তাদের অনেককেই সারাজীবন গ্রেনেডের স্পিøন্টার বহন করে চলতে হবে। কেউ কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব নিয়েই বেঁচে আছেন।
বস্তুত জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পাশাপাশি দলের প্রথমসারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এ ঘৃণ্য হামলা চালানো হয়। বিএনপি-জামাত সরকারের সময়ে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়।
গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মতিঝিল থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। ২০০৮ সালের ১১ জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে এই মামলাটির তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে, যা পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। মামলাটি তদন্তের ভার পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আখন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম যুক্ত করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।
মামলার আসামি : চার্জশিটে অভিযুক্ত ৫২ জনের মধ্যে ১৯ জন পলাতক, ৮ জন জামিনে রয়েছে এবং বাকিরা বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ফাঁসি হয়। মামলার আরেক আসামি মুফতি হান্নানের ফাঁসি হয়েছে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায়।
মামলার আসামি বিএনপি-জামাত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু কারাগারে রয়েছে। এ মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী এবং সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তাÑ সিআইডি’র সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডি’র সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদ জামিনে রয়েছে।
পলাতকদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়েছে লন্ডনে, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ মধ্যপ্রাচ্যে, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ হানিফ কলকাতা, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন আমেরিকায়, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার কানাডায়, বাবু ওরফে রাতুল বাবু ভারতে, আনিসুল মোরসালীন ও তার ভাই মহিবুল মুত্তাকিন ভারতের একটি কারগারে এবং মওলানা তাজুল ইসলাম দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। জঙ্গি নেতা শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মওলানা আবু বকর, ইকবাল, খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বদর ও মওলানা লিটন ওরফ জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, ডিএমপি’র তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (পূর্ব) ও ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) মো. ওবায়দুর রহমান এবং খান সৈয়দ হাসানও বিদেশে অবস্থান করছে। তবে আসামি হারিছ চৌধুরীর অবস্থান জানা যায়নি। পলাতকদের মধ্যে আরেক আসামি মওলানা তাজউদ্দিন আটক সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই।
গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আটজন আসামি। তারা হলেন মুফতি হান্নান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফ হাসান সুমন ও রফিকুল ইসলাম সবুজ। তবে মামলায় জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও জেএমবির সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন আসামির সংখ্যা ৪৯, যাদের মধ্যে তারেক রহমানসহ পলাতক রয়েছেন ১৮ জন।
গত ৩০ মে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা হয়েছে। ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ওই মামলায় এ পর্যন্ত ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে মামলার আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষী গ্রহণ চলছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই হত্যাকান্ডের বিচারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি সরকার নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছিল। শুধু তাই নয়, এই হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন আসামিপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ হবে। শিগগিরই বিচারকাজ শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও জজ মিয়া নাটক : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরদিন রাজধানীর মতিঝিল থানায় ২২ আগস্ট হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি মামলা হয়। প্রথম দফায় মতিঝিল থানার এসআই আমীর হোসেন আর দ্বিতীয় দফায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শামসুল ইসলাম মামলার তদন্ত করেন। মামলা তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান তড়িঘড়ি করে মামলা সিআইডি পুলিশের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। মামলা চলে যায় সিআইডিতে। বাবরের নির্দেশে শুরু হয় মামলা তদন্তের নামে প্রহসন। প্রথম দফায় মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিএনপি-জামাতের আশীর্বাদপুষ্ট সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমানকে। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েই তিনি ঢাকার ৫৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোখলেছুর রহমান, শৈবাল সাহা পার্থ, আব্বাসসহ ২০ জনকে পরিকল্পিতভাবে গ্রেফতার করেন।
এরপর গ্রেনেড হামলা মামলাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে দরিদ্র পরিবারের সন্তান জজ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে সোজা মালিবাগ সিআইডি অফিসে নেওয়া হয়। সে ছিল সামান্য দিনমজুর। জজ মিয়ার পুরো পরিবারকে আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার লোভ দেখায় সিআইডি। প্রথম দিকে সিআইডির প্রস্তাবে রাজি হয়নি জজ মিয়া। এরপর জজ মিয়ার ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। সিআইডির কথামতো না চললে জজ মিয়াকে কমপক্ষে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে। ফলে সারাজীবন জেলের অন্ধকারে থাকতে হবে। এ জীবনে আলোর মুখ দেখা হবে না। এমন ভয় দেখানো হয় জজ মিয়াকে। সর্বশেষ এতেও রাজি না হলে জজ মিয়াকে চোখ বেঁধে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যায় জজ মিয়া। শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে জজ মিয়া সিআইডির কথামতো রাজি হয়।
এমন চাপের মুখে জজ মিয়া আদালতে গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়। জজ মিয়াকে গ্রেফতারের পরদিন ২০০৫ সালের ১০ জুন গুলশান থানায় তদন্তাধীন থাকা এক ব্যবসায়ী হত্যার পুরনো মামলায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার হয় দুই ভায়রা আবুল হাশেম রানা ও শফিকুল ইসলাম। তাদেরও গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এ দুজনকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দিয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেন সিআইডির আলোচিত তিন কর্মকর্তা।
এমন জবানবন্দিকে পুঁজি করেই ২০০৪ সালের ২ অক্টোবর ১৫ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে ১১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিলের অনুমতি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চার্জশিটের অনুলিপি দেয় সিআইডির এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান।
মুন্সী আতিকের তদন্ত নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রশ্ন তুললে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রশীদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবদুর রশিদ ও ঢাকা মেট্রোর ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা স্পেশাল সুপারভাইজার (এসএস) এসপি রুহুল আমিন মামলা তদন্তের সার্বিক দায়িত্ব পালন করেন। মামলার তদন্ত নিয়ে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বরাবরই অভিযোগ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলাটির পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবীরকে। তদন্তে বেরিয়ে আসতে থাকে জজ মিয়া নাটকসহ চাঞ্চল্যকর কাহিনি। ২০০৮ সালের ১১ জুন মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে এই মামলাটির তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে, যা পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। মামলাটি তদন্তের ভার পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আখন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম যুক্ত করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।
পাকিস্তানি আর্জেস গ্রেনেড এবং বিএনপি-জামাত ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পরিকল্পনা : গ্রেনেড হামলা মামলায় সিআইডির তদন্তে উদঘাটিত হয় একের পর এক সত্য। হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেড ছিল পাকিস্তানি। তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে নেওয়া ১৫টি গ্রেনেড দিয়ে ওই দিন শেখ হাসিনার জনসভায় হামলা চালানো হয়। হাওয়া ভবনে ওই হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বৈঠক হয়। হাওয়া ভবনে বিএনপি চেয়ারপারসনের পুত্র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর নূর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, আবদুস সালামসহ বিএনপি-জামাতের শীর্ষ নেতা এবং মুফতি হান্নানসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের বৈঠকে গ্রেনেড হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে যা মুফতি হান্নাসহ অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে।

মুফতি হান্নান তার জবানবন্দিতে গ্রেনেড হামলার জন্য দায়ী করেন বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, আবদুস সালাম পিন্টু, তারেক রহমান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে।
স্বীকারোক্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রথম বৈঠক হয় হাওয়া ভবনে। সেই বৈঠকে ছিলেন তারেক রহমান, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফজ্জামান বাবর, আল মারকাজুল ইসলামের নায়েবে আমির আবদুর রশিদও।
পরদিন আরেকটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে হামলার সিদ্ধান্ত হয়। এই বৈঠকে পুলিশ ও গোয়েন্দারা সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।
তৃতীয় বৈঠকটি হয় মিন্টো রোডে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সরকারি বাসভবনে। এরপর সর্বশেষ বৈঠকটি হয় হামলার তিন দিন আগে। ১৮ আগস্টের ওই বৈঠকটি হয় বিএনপি আমলের শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায়। সেখানে পিন্টুর ছোট ভাই তাজউদ্দীন ও তার আত্মীয় আবু তাহের ছাড়াও ছিলেন হরকাতুল জিহাদের আমির আবদুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ, প্রধান কমান্ডার জাহাঙ্গীর বদর জান্দাল ও সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান উল্লাহ কাজল। বৈঠক চলাকালে ৩টি কালো গাড়ি যায় ওই বাসায়। এর একটিতে ছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। অন্য দুটি গাড়ি থেকে নামেন আরও দুজন। বৈঠক চলাকালে একটি সবুজ রঙের ব্যাগ থেকে দুটি প্যাকেট বের করেন বাবর। এর প্রতিটিতে ৫টি করে ১০টি এবং আরও দুটি খোলাসহ মোট ১২টি গ্রেনেড ছিল। গ্রেনেড হামলায় অবিস্ফোরিত একটি গ্রেনেড পরীক্ষা করে তৎকালীন দায়িত্বরত র‌্যাব কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, গ্রেনেডটি জার্মানির তৈরি। যা আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গি অধ্যুষিত দেশে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে পড়ে থাকা গ্রেনেডটির গায়ে লেখা ছিলÑ ‘URGES-84, Made in Germany’ এবং ‘গ্রেনেডটি মিলিটারি ভার্সন’।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সমাবেশে বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যার মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে নিশ্চিতভাবে হত্যা করতেই পাকিস্তান থেকে আর্জেস গ্রেনেড আনা হয়েছিল। ২১ আগস্টের পর সারাদেশ থেকে ৭৫টি ৮৪ মডেলের আর্জেস গ্রেনেড গ্রেনেড উদ্ধার হয়, যা পাকিস্তানের তৈরি অধিক উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক। যার মধ্যে একটি গ্রেনেড ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর এক খুনির সেলের সামনে থেকে কারা কর্তৃপক্ষ ও লালবাগ থানা পুলিশ উদ্ধার করে। শেখ হাসিনা গ্রেনেড হামলায় মারা গেলে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কারাগারের মূল ফটক উড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
গ্রেনেড হামলা পরিকল্পনার বৈঠকে তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাররের দেওয়া হামলায় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সহযোগিতার যে আশ্বাস দেওয়া হয়, তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটায় তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের প্রশাসন। যার প্রমাণ মেলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরদিন ২২ আগস্ট দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়Ñ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উল্টো দিকের বহুতল ভবন ‘সিটি ভবনের’ ছাদ থেকে পুলিশের সহায়তায় এই গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। সিটি ভবনের ছাদ থেকে যখন কয়েকজন জঙ্গি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তখন ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ সদস্যরা তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
তৎকালীন সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ সভাস্থলে নির্ধারিত সময়ের আগেই ঢাকা মহানগর পুলিশের পূর্ব বিভাগের ডিসি, এডিসি, এসি ও ওসির নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যাপারে নিয়ম অনুযায়ী তদারকি করার কথা। কিন্তু তারা কোনো তদারকি করেছেন এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা পাননি। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০০ কর্তব্যরত কর্মকর্তা ও সদস্য মোতায়েন ছিল। গ্রেনেড হামলার সময় তাদের কারও আগ্নেয়াস্ত্র থেকেই এক রাউন্ড গুলিও বর্ষণ করা হয়নি। কর্তব্যরত পুলিশ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সদস্যরা গ্রেনেড হামলা শুরুর পরপরই দায়িত্ব-কর্তব্য ফেলে দিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এমনকি বহুতল ভবনের ছাদের (রুফটের) সকল স্থানে পুলিশ ডিউটি দেওয়া হয়নি। দু-তিনটি ছাদে যাদের ডিউটি দেওয়া হয়েছিল তারাও গ্রেনেড হামলার শব্দ শুনে ছাদ থেকে পালিয়ে অন্যত্র দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, গ্রেনেড হামলার আগে সভাস্থলের আশপাশে ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়নি। এমনকি গ্রেনেড হামলার পাঁচ দিন পরও সভাস্থলে ডগ স্কোয়ার্ডকে নেওয়া হয়নি। গ্রেনেড হামলার পর একাধিক অবিস্ফোরিত গ্রেনেড উদ্ধারের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ ছিল না। আততায়ীরা এসব ঘটনায় সম্পূর্ণ নিরাপদে নির্বিঘ্নে গ্রেনেড হামলায় হতাহত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পেরেছে।

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তি

“এই মামলায় পূর্বে একবার স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলাম। তখন আমি সব কথা বলতে পারি নাই। মাননীয় মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্বেচ্ছায় একটি দরখাস্ত দিয়ে আরো কিছু কথা বলার ও লেখার আছে জানালে তিনি আমার দরখাস্ত মঞ্জুর করেছেন। আজকে কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন ওই বিষয়ে আমার বক্তব্য আপনার মাধ্যমে রেকর্ড করতে। আমি বিবেকের তাড়নায় পূর্বের প্রদত্ত দোষ স্বীকারোক্তির সঙ্গে আজকের বক্তব্য পেশ করিতেছি।

জোট সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে নেওয়া ১৫টি গ্রেনেড দিয়ে ওই দিন শেখ হাসিনার জনসভায় হামলা চালানো হয়। ওই হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিএনপির সংসদ সদস্য মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের মাধ্যমে জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে জোট সরকারের প্রতিনিধি ও তারেক রহমানের পরিচয় হয় এবং হাওয়া ভবনে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বৈঠক হয়।২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে। তখন বিএনপির সঙ্গে আমাদের সংগঠনের সম্পর্ক আরো জোরদার করার লক্ষ্যে হুজির আমির মাওলানা আবদুস সালাম, শেখ ফরিদ, মাওলানা ইয়াহিয়া, আবু বক্কর, জাহাঙ্গীর বদর (জান্দাল), চট্টগ্রামের এমপি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও কুমিল্লার মুরাদনগরের এমপি কায়কোবাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমাদের আমির আবদুস সালাম তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা ১৯৯৬ সালে ধানখালীতে গ্রেপ্তার হওয়া ৪১ জনকে হাইকোর্ট থেকে জামিনের ব্যবস্থা করে দেন। এইভাবে তাঁদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত থাকে এবং তাঁরাও সহায়তা করতে থাকেন।
২০০৩ সালের শেষের দিকে আমাদের আমির আবদুস সালাম, শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের যোগাযোগ হয়। তাঁরা বাবর সাহেবের বেইলি রোডের সরকারি বাসায় যান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জি কে গাউস, কমিশনার আরিফ (সিলেট), মাওলানা ইয়াহিয়া, আবু বক্কর ওরফে আবদুল করিম। আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেখানে আমির সাহেবের সঙ্গে আলোচনার পর জি কে গাউস এবং আরিফকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর সিলেটে কাজ করে যাওয়ার জন্য বলেন। এরপর সিলেটে স্থানীয় বিএনপি ও হরকতের লোকরা বিভিন্ন জায়গায় গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়।
২০০৪ সালের প্রথমদিকে হুজির একটি মিটিং হয়; যেখানে উপস্থিত ছিলেন আমির আবদুস সালাম, মাওলানা শেখ ফরিদ ও জান্দাল। মিটিংটি হয় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় হুজির অফিস দারুল আরকান মাদ্রাসায়। মিটিংয়ে আবু বক্কর, মাওলানা ইয়াহিয়াও উপস্থিত ছিলেন। মিটিংয়ে কিভাবে তারেক রহমান ও বাবরের সঙ্গে কথা বলা যায় সে আলোচনা হয়। পরে মোহাম্মদপুর সাতমসজিদে মাওলানা আবদুস সালাম, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা তাজউদ্দিন, কাশ্মীরী নাগরিক আবদুল মাছেদ ভাটসহ একসঙ্গে পরামর্শ করে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করি। মাওলানা তাজউদ্দিন গ্রেনেড সরবরাহ করার দায়িত্ব নেন। তাজ ভাই বলেন, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ও প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর আমাদের সাহায্য করবেন বলে জানিয়েছেন। তারেক রহমানের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর একদিন (তারিখ ও সময় মনে পড়ছে না) মুরাদনগরের এমপি কায়কোবাদ সাহেব আমাদের হাওয়া ভবনে নিয়ে গিয়ে তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমরা আমাদের কাজকর্মের জন্য তাঁদের সাহায্য ও সহযোগিতা চাইলে তারেক রহমান সর্বপ্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এরপর আমরা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যার জন্য মোহাম্মদপুরসহ আরো কয়েক জায়গায় গোপন মিটিং করি।

২০০৪ সালের আগস্ট মাসে (তারিখ স্মরণ নাই) সিলেটে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ঢাকার মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ সভার সংবাদ জানতে পারি। সেখানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেই। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পুনরায় তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত হয়। আমি মাওলানা আবু তাহের, শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা রশিদসহ আল মারকাজুলের গাড়িতে করে হাওয়া ভবনে যাই। সেখানে হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, জামায়াতে ইসলামের আলী আহসান মুজাহিদ, ব্রিগেডিয়ার রেজ্জাকুল হায়দার, ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিমকেও উপস্থিত পাই। কিছুক্ষণ পর তারেক রহমান আসেন। আমরা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তাঁদের সহায়তা চাই। তখন তাঁরা আমাদের সকল প্রকার প্রশাসনের সহায়তার আশ্বাস দেন।

তারেক সাহেব বলেন যে, আপনাদের এখানে আর আসার দরকার নাই। আপনারা বাবর সাহেব ও আবদুস সালাম পিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজ করবেন। তাঁরা আপনাদের সকল প্রকার সহায়তা করবে।
১৮ আগস্ট আমি আহসান উল্লাহ কাজল, মাওলানা আবু তাহেরকে নিয়ে আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমণ্ডির সরকারি বাসায় যাই। সেখানে আবদুস সালাম পিন্টু, বাবর, মাওলানা তাজউদ্দিন, কমিশনার আরিফ ও হানিফ পরিবহনের হানিফ উপস্থিত ছিলেন। পিন্টু ও বাবর বলেন যে, কমিশনার আরিফ ও হানিফ সাহেব আপনাদের সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করবে এবং আমাদের সকল প্রকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে। সে মোতাবেক ২০ আগস্ট জান্দাল ও কাজল আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে ১৫টি গ্রেনেড ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করে বাড্ডার বাসায় নিয়ে আসেন। পরদিন ২১ আগস্ট আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে গ্রেনেড হামলা চালাই।”
লেখা
জাহেদুর রহমান সোহেল
সাবেক কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগ সদস্য।