চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠা মৎস অবতরণ কেন্দ্রটি’র উচ্ছেদ ঠেকাতে রাতারাতি নাম পরিবর্তন করে হয়ে গেছে “বঙ্গবন্ধু ফিস ল্যান্ডিং সেন্টার”।

হাইকোর্টের আদেশে চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রম ঠেকাতে শেষমেষ বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহারেও পিছপা হননি দখলকারীরা। এতে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

জানা গেছে, গত বছর ৯ এপ্রিল কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা অপসারণ করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু স্থাপনাগুলো যথাযথ উচ্ছেদ না হওয়ায় এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করার বিষয় ব্যাখ্যা দিতে গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব করে হাইকোর্ট।

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সাথে বন্দর চেয়ারম্যানকে গত ২৬ জানুয়ারি স্বশরীরে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। ওইদিন তিনি কোর্টে হাজির হলে পুনরায় আদালতের নির্দেশ মেনে উচ্ছেদ চালাতে বলা হয়েছে।

এর অগে কর্ণফুলী নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে নয় বছর আগে হাইকোর্টে রিট করে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইআরপিবি)। এর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট হাইকোর্ট কয়েক দফা নির্দেশনাসহ রায় দেন। রায়ে ওই নদীর তীরে থাকা ২ হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা সরাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিকে গত ১০ ফেব্রæয়ারী বাংলাদেশ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির ‘মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি’র নাম পরিবর্তন করে কেন্দ্রটির প্রবেশপথে আরেকটি সাইন বোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে লেখা আছে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য বাজার এবং বঙ্গবন্ধু ফিস ল্যান্ডিং সেন্টার’। সাইনবোর্ডটি লাগানোর পর থেকেই এলাকায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ নাগরিকদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছে অবৈধ প্রতিষ্ঠানটির দখল ঠেকাতে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে সমিতির দায়িত্বশীলরা অপরাধ করেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সোনালি যান্ত্রিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বাবুল সরকার বলেন, সমিতির সদস্যদের সিন্ধান্ত অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু মৎস্য বাজার নামটি দেওয়া হয়েছে।’ অবৈধ উচ্ছেদ ঠেকাতে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবৈধ উচ্ছেদ ঠেকাতে নয় এখানে লোকজন ব্যবসা বাণিজ্য করেন। তবে ভুল হয়ে থাকলে আমরা শুধরে নেব।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কাছ থেকে ইজারা নিয়ে চাক্তাই ও রাজাখালী খালের মাঝখানে প্রায় চার একর জায়গায় এই স্থাপনা নির্মাণ করে বাংলাদেশ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। চবক ইজারা দিলেও জায়গাটির মালিকানা দাবি করে আসছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। কিন্তু তারা সরকারি জমি ইজারা নেওয়ার শর্ত ভঙ্গ করে নির্মাণ করেছে স্থায়ী পাকা দালান। মৎস্য বাজারের মার্কেটের দ্বিতলায় নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদও। এরপর জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির ব্যানারে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের প্রায় দুইশ দোকান ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়।

এদিকে কর্ণফুলী তীরের বাংলাদেশ মৎসজীবি সমবায় সমিতি লিমিটেড ও সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেডের এই অবৈধ স্থাপনাসহ সকল স্থাপনা উচ্ছেদের দাবীতে ইতোপূর্বে ১০টি সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধনও করা হয়। এতে বক্তারা বলেছেন, নির্দেশনা অনুযায়ী কর্ণফুলী তীরের ২১৮১ টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা না হলে উচ্চ আদালতে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে।

ইতোমধ্যে কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ নিয়ে তোড়জোড় শুরু হলে গত রবিবার দিবাগত রাতে বাংলাদেশ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির চাক্তাই নতুন মৎস্য বাজারের নাম পরিবর্তন করে কেন্দ্রটির প্রবেশপথে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য বাজার’ ও ‘বঙ্গবন্ধু ফিস ল্যান্ডিং সেন্টার’ নাম দিয়ে এবং বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত আরেকটি সাইন বোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন জানান, বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট হতে পূর্বানুমতি নিতে হয়। বাজারটি মৎস্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। অনুমোদনহীনভাবে বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করা হলে মন্ত্রণালয়কে সে বিষয়ে অবহিত করা হবে।’ এছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কর্ণফুলীর তীর থেকে সকল স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ শীঘ্রই শুরু করা হবে।

পাঠক নিউজ